ফাঁসি কার্যকরের জন্য ঢাকায় আনা হচ্ছে নিজামীকে

মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত আসামী জামায়াতে ইসলামীর আমির মতিউর রহমান নিজামীকে কাশিমপুর কারাগার থেকে ঢাকায় আনা হচ্ছে। রোববার রাতে তাকে নিয়ে ঢাকার উদ্দেশে রওয়ানা দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

 

একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধে জামায়াতের আমির ও কুখ্যাত বদর বাহিনীপ্রধান মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীকে কালপরশুর মধ্যেই ঝোলানো হতে পারে ফাঁসিকাষ্ঠে। নিরাপত্তাজনিত কারণে এই যুদ্ধাপরাধীর ফাঁসিও কার্যকর করা হচ্ছে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারেই। এ জন্য  কাশিমপুর থেকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে আনা হচ্ছে নিজামীকে। তার ফাঁসি কার্যকর করতে ইতোমধ্যে প্রাথমিক প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে কারা কর্তৃপক্ষ। কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার পার্ট-২-এর ৪০ নম্বর কনডেমড সেলে ছিলেন নিজামী। তার সামনে অপেক্ষা করছে শুধুই ফাঁসিকাষ্ঠের দড়ি (ম্যানিলা রোপ)। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো এমনটিই দাবি করেছে।

 

বৃহস্পতিবার একাত্তরের ঘাতক মতিউর রহমান নিজামীর মৃত্যুদণ্ডের বিরুদ্ধে করা রায় পুনর্বিবেচনার (রিভিউ) আবেদন খারিজ করেছেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। ফলে তার মৃত্যুদণ্ডাদেশ বহাল রয়েছে। সর্বশেষ রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষা চাওয়ার সুযোগ রয়েছে মাত্র। নিজামী প্রাণভিক্ষা না চাইলে বা প্রাণভিক্ষার আবেদন খারিজ হলে যে কোনো সময় তার দণ্ড কার্যকর করতে আইনি বাধা নেই।

 

আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও কারাসূত্র মতে, খুব শিগগিরই সর্বোচ্চ আদালত থেকে নিজামীর মৃত্যুদণ্ডাদেশের রায়ের কপি পাওয়া যাবে বলে আশা করা হচ্ছে। এরপর সরকারের নির্বাহী আদেশে কার্যকর করা হবে একাত্তরের শীর্ষ আলবদর নেতা ও যুদ্ধাপরাধী নিজামীর ফাঁসি। সূত্র মতে, পুরান ঢাকার নাজিম উদ্দিন সড়কে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের ফাঁসির মঞ্চেই নিজামীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সম্ভাবনা বেশি।

 

বর্তমানে এ ঘাতক কাশিমপুর কারাগারের কনডেমড সেলে বন্দি থাকলেও নিরাপত্তাজনিত কারণে সেখানে তার ফাঁসি কার্যকরের সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ। তাই মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত যুদ্ধাপরাধী সাকা চৌধুরী, আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ, মোহাম্মদ কামারুজ্জামান ও কাদের মোল্লার মতো ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের একই মঞ্চে একই কায়দায় নিজামীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকরা করা হবে।

 

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, আগামী দুই-একদিনের মধ্যেই একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধী মতিউর রহমান নিজামীকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে আনা হচ্ছে। সেখানে তার ফাঁসি কার্যকর করতে ফাঁসির মঞ্চ, ফাঁসির দড়ি, জল্লাদের তালিকা প্রস্তুতসহ প্রাথমিক প্রস্তুতি নিচ্ছে কারা কর্তৃপক্ষ। গোয়েন্দা সূত্র মতে, আগামী দুই-এক দিনের মধ্যে সর্বোচ্চ আদালতের লিখিত আদেশ পাওয়া গেলে বুধবার রাতে কার্যকর হতে পারে নিজামীর ফাঁসি।

 

এর আগে কারাগারে নিজামীর কাছে ম্যাজিস্ট্রেট পাঠিয়ে রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণ ভিক্ষা চাইবেন কিনা তা জানা হবে। আর স্বজনদের সঙ্গে শেষ সাক্ষাতের সুযোগ দেয়া হবে। তবে এগুলো শুধুই আনুষ্ঠানিকতা মাত্র। আদালতের রায়ের কপি পেলে এ সপ্তাহেই এই শীর্ষ যুদ্ধাপরাধীর ফাঁসি কার্যকর করা হচ্ছে বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

 

জানতে চাইলে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারগারের সিনিয়র জেল সুপার মো. জাহাঙ্গীর কবির বলেন, মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ফাঁসির আসামি নিজামীর ফাঁসি কোথায় কার্যকর করা হবে- সেটি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তের ব্যাপার। এ ব্যাপারে এখনো তিনি নিশ্চিত কিছু জানেন না। প্রস্তুতি সংক্রান্ত এক প্রশ্নের জবাবে জেল সুপার বলেন, ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে এ জাতীয় প্রস্তুতি সব সময়ই থাকে। উচ্চ পর্যায়ের গ্রিন সিগন্যাল পেলে সার্বিক প্রস্তুতি নিতে সময় লাগবে না।

 

অপরদিকে কাশিমপুর কারাসূত্র মতে, গাজীপুরের কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগারের পার্ট-২-এর ৪০ নম্বর কনডেম সেলে বর্তমানে বন্দি রয়েছেন জামায়াতের আমির যুদ্ধাপরাধী মতিউর রহমান নিজামী। নিজ সেলে বসেই তিনি বৃহস্পতিবার রেডিওতে শুনেছেন রিভিউ খারিজের কথা। শুক্রবার তার সঙ্গে দেখাও করেছেন স্ত্রীসহ স্বজনরা। এরপর থেকে ক্রমেই বিমর্ষ হয়ে পড়ছেন নিজামী। আঁটসাঁট কনডেম সেলে বসে মৃত্যুর প্রহর গুনছেন। তবে কারাবিধি অনুযায়ী তাকে খাবার পরিবেশন করা হচ্ছে ও খাবার খাচ্ছেন তিনি।

 

জানতে চাইলে কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার-২-এর  জেলসুপার প্রশান্ত কুমার বণিক জানান, মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি নিজামী কনডেম সেলে রয়েছেন। গতকাল পর্যন্ত এই আসামিকে ঢাকায় হস্তান্তরের কোনো নির্দেশ পাননি তিনি। উচ্চ পর্যায়ের নির্দেশমতো পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। চলতি বছরের ১৫ মার্চ নিজামীর আপিল মামলার মৃত্যুদণ্ডাদেশের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করেন দেশের সর্বোচ্চ আদালত। তার আপিল খারিজ করে ফাঁসি বহাল রেখে দেয়া এ রায়ের ভিত্তিতে ওইদিনই নিজামীর মৃত্যু পরোয়ানা জারি করেন বিচারিক আদালত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। সেদিন রাতেই কারাগারে লাল কাপড়ে মোড়ানো মৃত্যু পরোয়ানা ও ফাঁসির চূড়ান্ত রায়টি পাঠানো হয়।

 

পরদিন ১৬ মার্চ সকালে কাশিমপুর কারাগার পার্ট-২ এর কনডেম সেলে থাকা নিজামীকে মৃত্যু পরোয়ানা ও পূর্ণাঙ্গ রায় পড়ে শোনানো হয়। ২৯ মার্চ রিভিউ আবেদন করার পর থেকে মৃত্যু পরোয়ানা স্থগিত ছিল। সবশেষ বৃহস্পতিবার রিভিউ খারিজ হওয়ায় আবার সচল হয়েছে ওই মৃৃত্যু পরোয়ানা।

Related Post