Home / Bangladesh / সাভার ট্রাজেডি | একটি যোগ বিয়োগ ও ভাগের অংক

সাভার ট্রাজেডি | একটি যোগ বিয়োগ ও ভাগের অংক

বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় দূর্যোগগুলোর একটি হিসেবে সাভার ট্রাজেডির নামটা এখন প্রথমসারিতে চলে আসে। সাভার রানা প্লাজা দুর্ঘটনাকে আমি শুধু একটা দুর্ঘটনাই মনে করিনা, সেই সাথে এটাকে বাঙ্গালীর জাতির জন্য অনেক বড় একটা শিক্ষাকেন্দ্র হিসেবেও আমি মনে করি। কেনো জানেন? একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে যেমন গোটা জাতি এক হয়েছিলো মানুষের মত করে বাঁচার জন্য, তেমনি এই সাভার ট্রাজেডিতেও পুরো জাতি এক হয়েছিলো মানবতার জন্য।

তখন বুঝতে পারিনি ভালো লাগা উচিত হবে কি হবেনা, যখন শুনলাম একজনকে উদ্ধার করতে যেয়ে তার পা কেটে তাকে বের করতে হয়েছে। যে লোকটা পা কাটছিলো, তার চোখেই তখন বেশী পানি ছিলো। আর যার পা কাটা হচ্ছিলো, তার চোখে পানির সাথে ছিলো মুখভর্তি হাসি। বেঁচে ফিরতে পারার হাসি…

সেই রাতে পুরে‍া সাভার জেগে ছিলো। বোধহয় একটা মানুষও ঘুমায়নি। প্রায় আড়াই হাজার মানুষকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছিলো ধ্বংসস্তূপের ভেতর থেকে। আড়াই হাজার মানুষ কতগুলো, জানেন? আড়াই হাজার মানুষকে একসাথে দাঁড়া করালে মনে হবে কোনো রাজনৈতিক দলের মিটিং হচ্ছে। এতগুলা জীবিত মানুষকে ওখান থেকে বের করে আনা কি মুখের কথা? বললেই হয়ে যায়?

আমি নিজচোখে খুব কাছে থেকে দেখেছি সেই দিনগুলো। কেউ অবহেলা করেনি উদ্ধারকাজে। না দমকল বাহিনী, না প্রশাসন, না আপনার আমার মত সাধারণ জনগণ। ট্রাস্ট মি, সেদিন কেউই অবহেলা করেনি। হাতের কাছে যে যেটা পেয়েছে, সেটা নিয়েই এগিয়ে এসেছে…

আরিফ ভাইয়ের একটা কথা খুব মনে পড়ছে। সাভার ট্রাজেডির বিচ্ছিন্ন একটা দৃশ্যের বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি লিখেছিলেন, “সর্বপ্রথম দৌড়ে এসেছিলো লিটনের মা, খুন্তি নিয়ে। এমন ভাবে নড়তে নড়তে দৌড়ে এসেছিলো যে, পারলে তিনি তার হাতের খুন্তিটা দিয়েই সব ধসে পড়া ছাদগুলোকে আলগি দিয়ে তুলে দিবে !”

ধ্বংসস্তূপের ‌উপর উবু হয়ে শুয়ে দেয়াল খোঁচাতে থাকা এক দমকল কর্মী হঠাৎ করেই চেচিয়ে উঠে বলতে শুরু করলো, “ভাই কেউ একটা ডাইলের চামচ দেন। নিচে একজনকে দেখা যাচ্ছে। ওকে পানি খাওয়াতে হবে।” তার কথা শেষ হতে না হতেই ময়লা শাড়িতে ডাইলের চামচ মুছতে মুছতে দৌড়ে হাজির হয়ে গেলেন আরেক লিটনের মা !

এক উদ্ধারকর্মী চিৎকার দিয়ে বলছে, ‘কেউ একটা হাতুড়ি দেন আমাকে।’ সাথে সাথে সাভার এলাকা থেকেই দুইশ হাতুড়ি এসে হাজির। ওদিকে আবার ঢাকায় খবরটা আসতে আসতে দুইহাজার হাতুড়ি রেডি। সেদিন অক্সিজেনের দাম ৬০০ টাক‍া থেকে ৪০০ টাকায় নামিয়ে আনা হয়েছিলো। ফার্মেসি ওয়ালাদের সেদিন আর লাভ করতে মনে টানেনি। কোনো না কোনোভাবে উদ্ধারকাজে সাহায্য করেই গেলেন তারা। কয়টা দিনের জন্য যেনো দেশের সব মানুষগুলোই সত্যিকার অর্থে মানুষ হয়ে গেছিলো ! আমার এখনো মনে আছে, ‘অক্সিজেন ক্যান লাগবে’ লিখে আমি ফেসবুকে একটা পোস্ট করেছিলাম। একঘন্টার ভেতর সেখানে একশ অক্সিজেন ক্যান হাজির। এদিকে আবার ইরেশ জাকের ভাই তো এক পোস্ট দিয়ে উদ্ধারকার্যের জন্য এক ট্রাক যন্ত্রপাতিই ম্যানেজ করে ফেলেছেন ! সেই দিনগুলার কথা মনে পড়লে গর্বে বুকটা ফুলে যায়। দম আটকে যায় এই ঐক্যবদ্ধতা দেখে খুশি হয়েও হাসতে না পারার কারণে। খুব ভালো লেগেছে সাভার এলাকার তরুণ বৃদ্ধ এমনকি শিশু বাচ্চাগুলাকে দেখে, যারা সেখানে গেছিলো ‘একটু পানিটা পারলেও এগিয়ে দিতে’। এরা কিন্তু সেখানে ‘রানা প্লাজা ধসে যাওয়ায় যে ওপাশের আকাশ একেবারে ক্লিয়ার দেখা যাচ্ছে’ সেই দৃশ্যটা দেখতে যায়নি। সেখানে ভীড় জমানো মানুষগুলো কিন্তু সেদিন ‘শুধু উৎসুক জনতা’ হয়ে যায়নি, তারা গিয়েছিলো ‘উদ্ধারকাজে অংশ নিতে উৎসুক জনতা’ !

জানেন, সাভার ট্রাজেডির সময় কেউ বলেনি, শুধু মুসলমানের রক্ত চাই, নাস্তিকের রক্ত চাই না ! কেউ এমন কিছু বলেনি। সবার এক কথা, সাভারের জন্য রক্ত চাই ! সাভারের জন্য !

সেই সাভার ট্রাজেডি’র শেষটা কোথায়?

বলতে খুব লজ্জা লাগে, সাভার ট্রাজেডি’র প্রায় তিনবছর হয়ে আসছে, ক্ষতিগ্রস্তরা আজো তাদের প্রাপ্যটা পায়নি। তাদের কপালে জোটেনি প্রতিশ্রুত ক্ষতিপূরণ আর পুনর্বাসন। সামান্য যে অনুদান দেওয়া হয়েছে, তার বণ্টনও খুব স্বচ্ছ নয় বলে অভিযোগ ক্ষতিগ্রস্তদের। যতদূর জানি, ক্ষতিপূরণ আদায় না হওয়ার কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে ক্রেতা ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংগঠনগুলার অসহযোগীতা, সরকারের সঙ্গে অন্যান্য কর্তৃপক্ষের সমন্বয়হীনতা, দায়িত্বে অবহেলা, রাজনৈতিক প্রভাব ও স্বচ্ছতার অভাবকে !

দেশের আড়াইহাজার মানুষ একদিনে পঙ্গু হয়ে গেছে। ভাব‍া যায়? যেই দেড়হাজার শ্রমিক সেদিন মারা গেছে, তাদের কথা নাহয় বাদ দিলাম। শুধু এই আড়াই হাজারের কথাই বলি। এই একটা দিনেই আড়াইহাজার মানুষের কম করে হলেও আড়াইহাজারটা হাড়গোড় ভেঙ্গেছে। কম করে হলেও হাজারখানেক হাত পা কেটে বিচ্ছিন্ন করে শুধু বডিটা বের করে আনা হয়েছে। হাত পা ছাড়া মানুষটা তখনো হাসছিলো বেঁচে ফিরতে পারার আনন্দে !

এই মানুষগুলাকে আমরা কি দিতে পেরেছি? বলতে পারেন? যে লিটনেরা রানাপ্লাজার ধ্বংসস্তূপে চাপা পড়ে প্রাণ হারিয়েছিলো, ওদের বাপ মা ভাই বোন বউ বাচ্চাগুলা কি নিয়ে বেঁচে আছে, বলতে পারেন? ওদের কি ক্ষুদা পায় না? দুইবেলা খেতে হয়না ওদের? যে মানুষটাকে ওরা হারিয়েছে, তার জন্য কান্নায় বুক ফেটে আসেনা ওদের?

সেই সময়কার কিছু ‘নিখোঁজ বিজ্ঞপ্তি’র পোস্টার এখনো ওই এলাকার কয়েকটা দেয়ালে চোখে পড়ে। পোস্টারগুলো বৃষ্টিতে ভিজেও এখনপর্যন্ত বেঁচে আছে। কিন্তু নিখোঁজ বিজ্ঞপ্তির লেখাগুলো সব মুছে গেছে। লেখার সাথে সাথে নিখোঁজ হওয়া সেলিম, সামিউল, শিল্পি, আফরোজ আরার ছবিটাও প্রায় মুছে গেছে। আর বেশিদিন হয়ত থাকবেনা। একসময় হয়ত সাভার ট্রাজেডির কথাটাও পুরোপুরিভাবে মুছে যাবে আমাদের মন থেকে। একলা পড়ে থাকবে এই লেখাটা !

মাননীয় সরকার যেনো সাভার ট্রাজেডি তথা রানা প্লাজার ক্ষতিগ্রস্থদের স্বাভাবিক জীবনযাপণের জন্য কোনো ব্যবস্থা করে দেয়, পরিশেষে এটুকুই বলার থাকে। এরা সব শ্রমিক ছিলো। খেটে খাওয়া শ্রমিক। এরা ভিক্ষা করতে পারবেনা। এদের মাথা তুলে বাঁচতে পারার স্বাদটা ফিরিয়ে দেয়া আমাদেরই দায়িত্ব। খোঁজ নিয়ে জানতে পারবেন, আপনার আশেপাশেই এই ক্ষতিগ্রস্থদের অনেকে আছেন বা তাদের পরিচিতরা রয়েছেন। খোঁজ নিয়ে দেখুন, একটা মানুষের দায়িত্ব নিন। সারাজীবনের জন্য না হোক, অন্তত একটা দিনের জন্য। অনেক খুশি হবে এই মানুষগুলো…

কেমন হয়, যদি রানা প্লাজা দুর্ঘটনায় পা হারানো একটা ছেলেকে আপনার অফিসে দারোয়ানের চাকরীটা দেন? আপনি গেট দিয়ে ঢোকার সময় দারোয়ান বসা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে আপনাকে স্যালুট না দিলে কি আপনার মান যাবে? একবার ভেবে দেখেন তো, কেমন হয় যদি গেট দিয়ে ঢোকার সময় ওই ছেলেটাকে দেখেন, হাসিমুখে চোখ পিটপিট করে আপনার দিকে তাকিয়ে আছে !

হয়ত আমার মত তখন আপনার চোখেও পানি চলে আসবে …

Leave a Reply

[X]